বরিশালে ট্রিপল মার্ডারে দুই ঘাতকের স্বীকারোক্তি, প্রবাসীর স্ত্রী ও ভাতিজী আটক

ডিসেম্বর ০৮ ২০১৯, ১৯:১৮

রাহাদ সুমন, বিশেষ প্রতিনিধি : বরিশালের বানারীপাড়ায় আলোচিত ট্রিপল মার্ডারের রহস্য ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে উদঘাটিত হয়েছে। র‌্যাব ও পুলিশের কাছে ঘাতক রাজমিস্ত্রি জাকির হোসেন ও তার সহযোগী জুয়েল হাওলাদার এ ট্রিপল হত্যা ঘটনার আদ্যপান্ত খুলে বলার পাশাপাশি আদালতেও ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

উপজেলার সলিয়াবাকপুর গ্রামের কুয়েত প্রবাসীর বাড়ির দুই নির্মাণ শ্রমিক জাকির হোসেন ও জুয়েল হাওলাদার শুক্রবার রাতে প্রবাসীর বৃদ্ধা মা, ভগ্নিপতি ও খালাতো ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করে নিজেদের আড়াল করতে চেয়েছিল। কিন্তু র‌্যাব-পুলিশের কৌশলী পদক্ষেপে আটক জাকিরের মুখগলে বেড়িয়ে আসে হত্যার কারণ এবং তার সহযোগী অপর নির্মাণ শ্রমিক জুয়েল হাওলাদারের নাম। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে ঘাতক জুয়েল হাওলাদারকেও শনিবার রাতে বরিশাল শহর থেকে আটক ও প্রবাসীর বাসা থেকে লুটে নেওয়া স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে।

র‌্যাবের মিডিয়া শাখা এই তথ্য নিশ্চিত করে জানান ঘাতকদ্বয় জ্বীন নিয়ে আসার নামে ঘটনার রাতে নাটকীয়ভাবে ওই বাড়ির দরজা খোলা রেখে প্রবাসীর বাসায় প্রবেশ করে। শুক্রবার গভীর রাতে বানারীপাড়া উপজেলার সলিয়াবাকপুর গ্রামের কুয়েত প্রবাসী আব্দুর রবের বসত বিল্ডিংয়ে এই লোমহর্ষক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। প্রবাসীর বাড়িতে আরও সদস্যের বসবাস থাকলেও ওই রাতে বৃদ্ধ মা মরিয়ম বেগম (৭৫), বেড়াতে আসা ভগ্নিপতি শফিকুল আলম (৬৫) এবং খালাতো ভাই ইউসুফকে (৩২) শ্বাসরোধ করে হত্যার সময়ক্ষণ কেউ আঁচ করতে পারেনি । সকালে বৃদ্ধার কলেজ পড়ুয়া নাততি আছিয়া আক্তার জেগে উঠে দাদির মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে ঘটনা নিয়ে হৈই চৈই পড়ে যায়। পরে ঘরের অন্য কক্ষে ভগ্নিপতি শফিকুল আলম এবং বাড়ির পুকুরে খালাতো ভাই ভ্যানচালক ইউসুফের হাত-পা বাঁধা লাশ পর্যায়ক্রমে পাওয়া যায়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে গোটা বানারীপাড়া শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।

শত শত নারী-পুরুষ ওই বাড়িতে ভিড় জমায়। ঘাতক কে বা পরিচয় কী এমন প্রশ্নে পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব,পিবিআই ও সিআইডি উত্তর খুঁজতে এগিয়ে আসে। অবশ্য ঘটনা জানাজানির পরপরই শনিবার সকালে স্থানীয় থানা পুলিশ বাড়িতে অবস্থানরত নির্মাণ শ্রমিক জাকির হোসেনকে আটক করে।

বরিশাল রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি এহেসান উল্লাহ, বরিশাল-র‌্যাব-৮’র কোম্পানী কমান্ডার মেজর খান সজিবুল ইসলাম, জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুর রকিব, র‌্যাবের এএসপি ইফতেখার সহ র‌্যাব, পুলিশ, পিআইবি ও সিআইডির কর্মকর্তারা পরবর্তীতে থানা অভ্যন্তরে একান্তে জাকির হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে হত্যাকান্ডে নিজের সংশ্লিষ্টতা স্বীকার করে জুয়েল নামে একজন সহযোগীর নাম প্রকাশ করে।

শনিবার বেলা ১২ টার ভেতরে র‌্যাবের একটি টিম গোটা হত্যাকান্ডের ক্লু উপলব্ধি করে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে জুয়েলের অবস্থান শনাক্তে মাঠে নামে। শনিবার রাতে বরিশাল শহরের পশ্চিম মতাশার মুহুরিকান্দা এলাকা থেকে জুয়েলকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। এই সময় জাকিরের বরিশাল নগরীর সাগরদীর ভাড়া বাসা থেকে ওই রাতে লুণ্ঠিত স্বর্ণালঙ্কার ও তিনটি মোবাইল সেটসহ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করে।

গ্রেপ্তার জুয়েল ও জাকিরকে মুখোমুখি করা হলে উভয়ে অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানায় লোভের বশবর্তী তিনজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পুর্বে তারা ওই জ্বীন নিয়ে আসার নাটক সাজিয়ে ছিল।

র‌্যাব সূত্র জানায়- জাকির দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী আব্দুর রবের বাড়িতে নতুন ভবন নির্মাণে শ্রমিকের কাজে নিয়োজিত থাকার পাশাপাশি জ্বীনের ওঝাঁ বা বাদশা পরিচয় দিয়ে নিজের দক্ষতা প্রকাশ করে পরিবারের সাথে ঘনিষ্ট হয়ে ওঠে। যাতায়াতের সূত্র ধরে প্রবাসীর বাড়িতে বেশি মাত্রার স্বর্ণালঙ্কার থাকার ধারণায় সদ্য কাজে যোগদান করা অপর সহযোগী নির্মাণ শ্রমিক জুয়েলের সাথে চুরির পরিকল্পনা করে। কিন্তু ঘটনার রাতে জ্বীন নিয়ে আসার নামে বাড়ির দরজা খোলা রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও পিরোজপুরের স্বরুপকাঠি থেকে বেড়াতে আসা প্রবাসীর ভগ্নিপতি শফিকুল আলম ও খালাতো ভাই ইউসুফের উপস্থিতি অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। একপর্যায়ে উভয় ঘাতক মিলে একে একে তিনজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

তবে পুলিশের একটি সূত্র জানায়- যুবক ইউসুফ প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টায় ক্ষুব্ধ হয়ে প্রথমে তাকে হত্যার পর বাড়ির পার্শ্ববর্তী পুকুরে হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয়া হয়। এই ঘটনা মরিয়ম ও শফিকুল আলম আঁচ করতে পারায় তাদেরকেও একই পরিণতির শিকার হতে হয়। হত্যাকান্ডের পরে ভোরে গ্রামবাসীর অলক্ষ্যে জুয়েল লুণ্ঠিত মালামাল নিয়ে বরিশাল শহরে চলে যায়। কৌশলগত কারণ অর্থাৎ নিজেকে নির্দোষ প্রমাণে বাড়িতে রাতে অবস্থানকারী জাকির ওই এলাকায়ই থেকে যায়। মূলত সে প্রচার করতে চেয়েছিল গোটা ঘটনাটি চুরি-ডাকাতির ঘটনা। কিন্তু তার সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে পুলিশ প্রাথমিকভাবে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে আসে। খবর পেয়ে বরিশাল র‌্যাবের একটি টিম ছায়া তদন্তের আলোকে গ্রামে ঘুরে থানায় গিয়ে জাকির হোসেনকে কৌশলে জিজ্ঞাসাবাক করা মাত্রই সে পুরো ঘটনার স্বীকারোক্তি দেয়।

এদিকে ঘটনার একদিন পর রোববার সকালে প্রবাসী হাফেজ আ. রবের ছোট ভাই ঢাকায় এনআরবি ব্যাংকে কর্মরত সুলতান মাহামুদ বাদী হয়ে বানারীপাড়া থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

অপরদিকে শনিবার জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে প্রবাসীর স্ত্রী মিশু ও ভাতিজী আছিয়া জানিয়েছিলেন শুক্রবার রাতে রাজমিস্ত্রি জাকির হোসেন ও অপর এক বেটে মতো দাড়িওয়ালা ব্যক্তি তাদের ঘুম থেকে জাগ্রত করেন। এসময় মিশুকে বিবস্ত্র করে জাকির হোসেন আপত্তিকর ছবি তোলেন। তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিকে দিয়ে জাকির হোসেন বিবস্ত্র মিশুকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় বেশ কিছু আপত্তিকর ছবি তোলান এবং হত্যাকান্ডের বিষয়ে মুখ খুললে ওই ছবি ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে মিশুকে হুমকি দেন।

এছাড়াও তাদের দু’জনকে কোরআন শরীফ স্পর্শ করিয়ে এ বিষয় কাউকে না বলার জন্য কসম কাটানো হয়। এ হত্যাকান্ডের বিষয় কাউকে জানালে জ্বীন ও পরীর মাধ্যমে তাদের ক্ষতি করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। বিশেষ করে মিশুর দুই শিশু সন্তানের বড় ধরণের ক্ষতি হবে বলেনও হুশিয়ারী দেওয়া হয়।

আছিয়া আক্তার আরও জানান বিয়ে হলেও তার কখনও সন্তান হবে না এবং মিশু জানান তার লিভার রোগ রয়েছে জানিয়ে জিনের বাদশা দাবীদার জাকির হোসেন এর আগে তাদের দু’জনকে বিভিন্ন তদবির দেন। বিষয়টি জেনে পুলিশ ওই বাসা থেকে তদবির দেওয়া তাবিজ কবচ ও পাটা-পুতা উদ্ধার করে। জ্বীন-পরীর ভয় দেখিয়ে ওই পরিবারটিকে গত তিন বছর পর্যন্ত জিম্মি করে রাখা হয়।

অপরদিকে শুক্রব্রা ভোর রাত ৪টায় প্রবাসীর স্ত্রী মিশু তার ব্যক্তিগত বিকাশ একাউন্ট থেকে রাজমিস্ত্রি জাকির হোসেনের কাছে ৫ হাজার টাকা পাঠান। যা নিয়ে রহস্য আরও ঘণীভূত হয়। ফলে এ ট্রিপল হত্যাকান্ডে পরকীয়া প্রেম সংক্রান্ত বিষয়টি সামনে চলে আসে। আলোচিত এ হত্যাকান্ডে প্রবাসীর স্ত্রী মিশরাত জাহান মিশু ও কলেজ ছাত্রী আছিয়া আক্তারের কোন সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা সেটা খতিয়ে দেখছে পুলিশ ট্রিপল এ হত্যাকান্ড শুধু কি স্বর্নালঙ্কার ও টাকা পয়সা লুটের কারণে নাকি পরকীয়া প্রেমের কোন ঘটনা রয়েছে কিনা তা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ।

রোববার সকালে প্রবাসীর স্ত্রী মিশরাত জাহান মিশু ও ভাতিজী কলেজ ছাত্রী আছিয়া আক্তার আফিয়াকে থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। ওই দিন বিকালে হত্যাকান্ডের শিকার ওই তিনজনের জানাজা ও দাফনের সময় মিশু ও আছিয়াকে পুলিশ প্রহরায় বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাদেরকে আবারও থানায় নিয়ে আসা হয়।এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তাদের দু’জনকে থানায় আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত ছিলো। এদিকে রোববার দুপুরে বরিশাল আদালতে হত্যাকান্ডের দায় স্বীকার করে দুই ঘাতক জাকির হোসেন ও জুয়েল হাওলাদার স্বীকারোক্তিমূলক জবান বন্দি দিয়েছে বলে জানা গেছে।

অপরদিকে ময়নাতদন্ত শেষে রোববার বিকালে হত্যাকান্ডের শিকার ওই তিনজনের প্রথমে সলিয়াবাকপুর এ রব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে মরিয়ম বেগমকে বানারীপাড়ার সলিয়াবাকপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

অপর দু’জনের মধ্যে শফিকুল আলমকে স্বরূপকাঠির ছারছীনা দরবার শরীফে দ্বিতীয় জানাজা শেষে আকলম গ্রামে ও বানারীপাড়ার ধারালিয়া গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে ইউসুফের লাশ দাফন করা হয়।




আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

April 2020
M T W T F S S
« Mar    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
27282930  

আমাদের ফেসবুক পাতা


এক্সক্লুসিভ আরও

%d bloggers like this: