ব্রেকিং নিউজ

আহারে রাস্তা, সরকার টাহা দিয়া এইয়া করায়!

জুন ১৩ ২০২১, ১৯:৩৭

জহির খান: আহারে রাস্তা, সরকার টাহা (টাকা) দিয়া এইয়া করায়। এই রহম কামের কারণেই সরকারের মান-ইজ্জত যায়। সরকার তো ঠিকই টাকা দেয়, কিন্তু অবিসার (কর্মকর্তা) আর কন্ট্যাক্টর (ঠিকাদার) মিললা এমন চুরি করে যে কাম শেষ হওয়োনের আগেই রাস্তার পিচ ঢালাই উইট্টা যায়। রাস্তা ডাইবা যায়। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ক্ষুব্ধ কন্ঠে এই কথাগুলো বলছিলেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার শোলক ইউনিয়নের কাশিং গ্রামের বাসিন্দা ভ্যান চালক মো. জাকির হোসেন।

পঞ্চাশ বছর বয়সী এই ব্যক্তির মতো এমন শতাধিক মানুষের অভিযোগ রয়েছে উপজেলার ব্যস্ততম সানুহার-ধামুড়া সড়কের সংষ্কার কাজের মান নিয়ে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে ওই সড়কের সংষ্কার কাজে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংস্কার কাজ শেষ না হতেই ইতোমধ্যে ওই সড়কের কয়েকটি অংশের পিচ ঢালাই (কার্পেটিং) উঠে গেছে। পিচ, পাথর ও বিটুমিনসহ চলমান সংস্কার কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে নিম্নমানের কাজ করে লাখ লাখ টাকা লোপাট করছেন। মানসম্মত কাজ না হওয়ায় পুরো সংষ্কার কাজ শেষ না হতেই পিচ ঢালাই উঠে যাচ্ছে। যা নিয়ে এলাকাবাসী, পথচারি এবং ওই রাস্তা ব্যবহার করে চলাচলকারি বিভিন্ন যানবাহন চালকদের মাঝে বিরাজ করছে চরম অসন্তোষ। তবে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রকৌশলীরা বলছেন, সংস্কার কাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়নি, কাজের গুনগত মান এখনও পর্যন্ত ঠিক রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার সানুহার বাসস্ট্যান্ড থেকে ধামুরা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে সাড়ে চার কিলোমিটার রাস্তা সংষ্কারের কাজ চলছে।

ওই রাস্তার সেনেরহাট বাজার সংলগ্ন এলাকায় ঠিকাদারের লোকজন গাছের পাতা ও ময়লা আর্বজনা পরিস্কার না করে ওভারলে এর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। নিয়ম অনুসারে কম্প্রেশার মেশিন দিয়ে সড়ক পরিষ্কার করে প্রাইমকোর্ট দিয়ে পিচ ঢালাইয়ের কাজ করতে হবে। কিন্তু তা না করে গাছের পাতা ও ময়লার ওপরই চলছে কার্পেটিং এর কাজ। ঠিকাদারের লোকজন বালু পাথর বিটুমিনসহ নিম্নমানের সব উপকরণ দিয়ে কাজ করছে এবং প্রয়োজনের তুলনায় পুরুত্ব কম দিচ্ছে। এমনকি সংষ্কার কাজের ব্যবহৃত মিক্সিংয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের সামগ্রীসহ পরিমাপ মতো বালি, পাথর ও বিটুমিন ব্যবহার হচ্ছে না। ওই রাস্তাটির প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নিম্নমানের বিটুমিন, বালি, পাথরের মিশ্রনে সঠিক সিডিউল মাফিক কাজ না হওয়ায় চলমান সংস্কারকৃত সড়কে এবড়ো থেবড়ো হয়ে আছে।

যার কারণে যানবাহন চলাচলের সময় চাকার প্রেশারে অনেক জায়গার কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার সানুহার বাসস্ট্যান্ড থেকে ধামুরা বন্দর পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘদিন ধরে বেহাল অবস্থায় পড়েছিলো। এতে ওই রাস্তা দিয়ে চলাচলকারিদের অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। দুর্ঘটনার শিকারও হয়েছেন অনেকে। একপর্যায়ে চলতি বছরের শুরুর দিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে পল্লী সড়ক ও ব্রীজ/কালভার্ট মেরামত করন জি.ও.বি. মেইনটেন্যান্স প্রকল্পের আওতায় বেহাল দশার ওই সাড়ে চার কিলোমিটার রাস্তাটির সংষ্কারের জন্য অনুমোদন হয়।

উপজেলা এলজিইডি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার সানুহার-ধামুরার ওই রাস্তাটির কচুয়া নামকস্থান থেকে ধামুরা বন্দর পর্যন্ত সাড়ে চার কিলোমিটার দীর্ঘ অংশের সংস্কারের জন্য চলতি বছরের শুরুর দিকে দরপত্র আহ্বান করা হয়। যার প্রাক্কলিন ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ৩৬ লক্ষাধিক টাকা। তবে ১৮ শতাংশ লেসে ১ কোটি ৯৩ লাখ টাকায় কাজটির কার্যাদেশ পায় মেসার্স মিজান মীম আলিফ ট্রেডার্স (জে.বি) নামের একটি যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

চলতি বছরের শুরু থেকে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কাজটি শেষ হওয়ার কথা। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করতে না পারায় শেষ সময়ে এসে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের মাধ্যমে তড়িঘড়ি করে কাজটি সমাপ্তের চেষ্টা চালাচ্ছেন ঠিকাদার মাহাবুবুর রহমান মিরন। তিনি উপজেলা যুবলীগের সাবেক সহ-সভাপতি হওয়ায় নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে রাস্তা সংষ্কারের কাজ করলেও স্থানীয়রা কোন প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। কচুয়া গ্রামের নিবির বাড়ৈ ও ইমন হাওলাদারসহ একাধিক বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেন, রাস্তাটি সংষ্কারে এতোটা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হচ্ছে যে, কাজ শেষ না হতেই রাস্তার অনেক অংশের পিচ ঢালাই উঠে গেছে। হাত দিয়ে টান দিলেই রাস্তা উঠে যাচ্ছে।

তাদের দাবি, নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে সংষ্কার করা এই রাস্তা চলতি বর্ষা মৌসুমেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। স্থানীয় কাংশি গ্রামের বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম সরদার, মতিউর রহমান, সেনেরহাট এলাকার বাসিন্দা আলমগীর হাওলাদার ও বামরাইল ইউপির হস্তিশুন্ড গ্রামের সফিকুল ইসলাম জানান, প্রায় চার মাস আগে সড়কের সংস্কার কাজ শুরু হয়েছে, যা এখনও পর্যন্ত চলমান। কিন্তু এরই মধ্যে সংষ্কারাধীন ওই রাস্তাটির বিভিন্ন স্থানের পিচ-পাথর ওঠে গেছে। তাদের দাবি, রাস্তাটি সংস্কারে সরকার ঠিকই অর্থ দিচ্ছে কিন্তু এলজিইডি’র উপজেলা কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন মিলেমিশে নিম্নমানের কাজ করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। আর এর ঘেসারত দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

নিম্নমানের কাজ করার অভিযোগ অস্বীকার ওই সড়কটি সংষ্কারের কাজে নিয়োজিত ঠিকাদার ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মো. মাহবুবুর রহমান মিরন মুঠোফোনে জানান, এই কাজটি বরিশাল জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় মেইনটেন্যান্স’র কাজ। এই কাজটি স্বয়ং এলজিইডি বরিশালের নির্বাহি প্রকৌশলী দেখভাল করেন। প্রতিনিয়ত কাজের মান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ল্যাবে পরীক্ষা করা হয়। তারপরেও নির্মাণ কাজে কোন ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যে ব্যবস্থা নিবেন আমরা সেটা মানতে রাজি। আমরা সংষ্কার কাজটি শতভাগ ভালো করার চেষ্টা করছি।

আমি চ্যালেঞ্চ করে বলতে পারি, পুরো উপজেলার মধ্যে এই কাজটি সবচেয়ে মানসম্মত হচ্ছে। সংষ্কার কাজ শেষ না হতেই রাস্তার কার্পেটিং উঠে যাওয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে ঠিকাদার মিরন অভিযোগ করে জানান, গত বুধবার (৯ জুন) বিকেলে কচুয়া পল্লী বিদ্যুতের সাব সেন্টার সংলগ্ন এলাকা থেকে কাশিং ব্রিজ পর্যন্ত প্রায় ১ কিলোমিটার পিচ ঢালাইয়ের কাজ করা হয়। কিন্তু বুধবার দিবাগত রাতের আঁধারে রাস্তাটির কয়েকটি স্থান থেকে কতিপয় দুর্বৃত্তরা সেই পিচ ঢালাই লোহার রড কিংবা শাবল দিয়ে উঠিয়ে ফেলে। যদিও পরবর্তীতে আমরা সেটা ঠিক করে দিয়েছি।

এছাড়া রাতের আঁধারে রাস্তা খোড়াখুড়ির ঘটনায় ইতোমধ্যে উজিরপুর মডেল থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। সংষ্কার কাজে কোন প্রকার অনিয়ম হচ্ছে না জানিয়ে উজিরপুর উপজেলা এলজিইডি প্রকৌশলী মীর মাহিদুল ইসলাম জানান, ‘রাস্তাটির পুরুত্ব হবে ২৫ মি.লি। সেই অনুযায়ী সংষ্কার কাজ চলছে এবং গুনগত মান এখনও পর্যন্ত ঠিক রয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকদিন আগে রাতের আঁধারে কতিপয় লোকজন রাস্তাটির কয়েকটি স্থান খোড়াখুড়ি করে তা আবার দিনের বেলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল করেছে। এরপরই আমরা ঠিকাদারকে বলেছি, রাস্তার কাজ আপাতত বন্ধ থাকবে, যারা রাস্তা খুড়েছে তাদের বিরুদ্ধে আগে আইনি পদক্ষেপ ও ঘটনার তদন্তের পরেই পুন:রায় কাজ চলবে।’

 




আজকের আবহাওয়া

পুরাতন সংবাদ খুঁজুন

August 2021
M T W T F S S
 1
2345678
9101112131415
16171819202122
23242526272829
3031  

আমাদের ফেসবুক পাতা


এক্সক্লুসিভ আরও

1698 Shares
%d bloggers like this: